সিলেট ভ্রমণ
সিলেট ভ্রমণ
সিলেট ভ্রমণ: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সিলেট জেলা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, এটি প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। পাহাড়, ঝরনা, চা-বাগান, নদী আর সবুজে ঘেরা এই জেলাটি প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। সিলেট ভ্রমণ যেন এক স্বপ্নের জগতে প্রবেশের মতো।অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই প্রাচীন জনপদ বনজ, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও সিলেটের রয়েছে প্রসিদ্ধ ইতিহাস। সিলেটে বসবাসকারি বিভিন্ন আদিবাসীদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল জলাবন, হাকালুকি হাওর, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, তামাবিল, পাহাড়, ঝর্ণা সব মিলিয়ে নানা বৈচিত্রের সম্ভার এই সিলেট দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী।
যাত্রার শুরু: সিলেট শহরে পা রাখা
সিলেট শহরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে যে জিনিসটি প্রথম নজরে আসে তা হলো এখানকার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং শান্তিপূর্ণ মনোরম পরিবেশ। শহরের রাস্তা, দোকানপাট, মসজিদগুলোতে একধরনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেখা যায়। সিলেটের মানুষজন অতিথিপরায় যারা আপনাকে আপন করে নেবে।
চা-বাগানের শহর:
মালনীছড়া চা বাগান হল বাংলাদেশের সিলেট জেলায় অবস্থিত একটি চা বাগান। এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের বৃহত্তম এবং সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত চা বাগান। ১৮৫৪ সালে লর্ড হার্ডসন ১৫০০ একর জায়গার উপর এটি প্রতিষ্ঠা করেন।এই চা বাগানটি সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে
স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত।সিলেটকে বলা হয় চায়ের
রাজ্য। এখানে শতাধিক চা-বাগান রয়েছে।লালাখাল
মালনীছড়া, শ্রীমঙ্গলসহ অসংখ্য এলাকায়
বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান চোখ জুড়িয়ে
দেয়।চা-বাগানের পাশেদাঁড়িয়ে টাটকা
পাতা তুলতে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
জাফলং: পাথর আর নদীর সুরে হারিয়ে যাওয়া
জাফলং, বাংলাদেশের সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার
অন্তর্গত, একটি পর্যটনস্থল। জাফলং, সিলেট শহর থেকে
৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত
ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, এবং
এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা
বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।
পর্যটনের সাথে জাফলং পাথরের জন্যও বিখ্যাত। শ্রমজীবী মানুষেরা পাথরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে সেই বহু বছর যাবত৷জাফলং সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য।
এখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবেন পাহাড় থেকে নেমে
আসা স্বচ্ছ পানির ধারা, ঝর্ণা, এবং পাথর উত্তোলনের দৃশ্য।
ডাউকি নদীর নীল জল আর ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন চোখে লেগে থাকে।
রাতারগুল জলাভূমি বন: জলের বনে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা
রাতারগুল জলাবন সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি মিঠাপানির জলাবন। একসময় বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন হিসেবে মনে করা হতো রাতারগুলকে।তবে পরবর্তীতে জুগিরকান্দি মায়াবন, বুজির বন ও লক্ষ্মী বাওড় জলাবন নামে আরও জলাবন বাংলাদেশে খুঁজ মিলে।পৃথিবীতে মিঠাপানির যে ২২টি মাত্র জলাবন আছে, “রাতারগুল জলাবন” তার মধ্যে অন্যতম।এই জলাবনের আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। একে রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট হিসাবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন রাতারগুল।বর্ষাকালে নৌকায় চেপে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা অসাধারণ। এখানে নির্জনতা,পাখির কিচিরমিচির শব্দ এবং জলের উপরে গাছের ছায়া এক আলাদা জগতের জন্ম দেয়।
বিছানাকান্দি: পাহাড়, নদী ও পাথরের মিলনস্থল
বিছনাকান্দি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর
ইউনিয়নে অবস্থিত। বিছনাকান্দি মূলত জাফলং ও
ভোলাগঞ্জের মতই একটি পাথর কোয়ারী। বাংলাদেশ-
ভারত সীমান্তের খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই
পাশ থেকে এসে বিছনাকান্দিতে মিলিত হয়েছে। সেই
সাথে মেঘালয় পাহাড়ের খাঁজে থাকা সুউচ্চ ঝর্ণা
বিছনাকান্দির প্রকৃতিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পর্যটকদের
কাছে বিছানাকান্দির মূল আকর্ষন হচ্ছে পাথরের উপর
দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে শুভ্র
মেঘের উড়াউড়ি। প্রথম দেখায় আপনার মনে হবে এ
যেন এক পাথরের বিছানা, আর স্বচ্ছ পানিতে গা এলিয়ে
দিতেই যে মানসিক প্রশান্তি পাবেন এই প্রশান্তি আপনাকে বিছানাকান্দি টেনে নিয়ে যাবে বারবার। এ যেন পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর পাথর মিলিয়ে প্রাকৃতিক মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে বিছানাকান্দি।বিছানাকান্দি একটি অফবিট লোকেশন হলেও বর্তমানে পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা পরিবেশ, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী এবং পাথরগুলো এক স্বপ্নের দৃশ্যপট তৈরি করে।
শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) এর মাজার
সিলেট ভ্রমণে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক
গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হযরত শাহজালাল (রহ.) ও
শাহপরান (রহ.) এর মাজার। প্রতিদিন হাজারো ভক্ত ও
পর্যটক এখানে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করতে আসেন।
শাহ জালালের দরগাহ, সিলেট শহরের একটি আধ্যাত্মিক
স্থাপনা, যা মূলত ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে আগত
পাশ্চাত্যের ইসলাম ধর্মপ্রচারক শাহ জালালের বাসস্থান
ও শেষ সমাধি। এই দরগাহ সিলেট শহরের উত্তর প্রান্তে
একটি টিলার উপর অবস্থিত। কারো কারো মতে সিলেট
ভূমির মুসলিম সভ্যতা ও ধর্মমত এই দরগাহকে কেন্দ্র করে প্রসার লাভ করেছে।শাহ জালালের লৌকিক ও লৌকিক স্মৃতি বিজড়িত এই স্থান সিলেটের অন্যতম পূণ্য তীর্থহিসেবে পরিচিত।ঐতিহাসিক অচ্যুৎচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির মতে এই দরগাহ থেকে প্রেরিত শাহ জালালের সঙ্গী অনুসারীদের দ্বারা ঢাকা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ত্রিপুরা, কুমিল্লা ও আসাম প্রভৃতি স্থানে মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রচার ও প্রসার হয়েছে।বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাৎসরিক উরস উপলক্ষে প্রতিবছর হাজার হাজার লোক এখানে এসে শাহ জালালের উপলক্ষ ধরে (অসিলা) স্রষ্টার কাছে ভক্তি নিবেদন ও কৃতজ্ঞতা জানান।
শাহ পরাণের মাজার সিলেট শহরের একটি পুণ্য তীর্থ বা
আধ্যাত্মিক স্থাপনা। যা হচ্ছে ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে মধ্যপ্রাচ্য
হতে বাংলাদেশে আসা ইসলাম প্রচারক শাহজালালের
অন্যতম সঙ্গী অনুসারী শাহ পরাণের সমাধি। এটি
সিলেট শহরের পূর্ব দিকে খাদিম পাড়া বর্তমান নাম
খাদিম নগর এলাকায় অবস্থিত। শাহ জালালের দরগাহ
থেকে প্রায় ৮ কি.মি. দুরত্বে শাহ পরাণের মাজার
অবস্থিত। শাহ জালালের দরগাহর মতো এই মাজারেও
প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। ঐতিহাসিক মুমিনুল হক সহ অনেকেই লিখেছেন; সিলেট বিভাগ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকায় শাহ পরাণের দ্বারা মুসলিম ধর্ম বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার হয়েছে।
স্থানীয় খাবার
সিলেটের খাবারও কম কিছু নয়। এখানে 'সাতকরা', 'শুঁটকি ভুনা', 'চিংড়ির মালাইকারি' বা 'তেতুল রস' সহ স্থানীয় রান্নার স্বাদ অসাধারণ। তাছাড়াও পানের জন্য বিখ্যাত সিলেটি পান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও আলাদা।
কিছু ভ্রমণ টিপস:
👉বর্ষাকালে গেলে রাতারগুল বা বিছানাকান্দি বেশি উপভোগ্য।
👉স্থানীয় গাইড সঙ্গে নিলে অজানা অনেক কিছু জানতে পারবেন।
👉ড্রোন বা ক্যামেরা ব্যবহার করলে স্থানীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলুন।
👉সিলেটের গ্রামীণ এলাকায় ভ্রমণের সময় সম্মান ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
উপসংহার
সিলেট একটি এমন জায়গা যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান, ধর্মীয় দর্শনীয় স্থান এবং সংস্কৃতি সব একত্রে মিশে আছে। একবার সিলেট গেলে মন চায় বারবার ফিরে যেতে। যদি আপনি প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তাহলে সিলেট আপনার জন্য স্বপ্নের গন্তব্য হতে পারে।
No comments